আসসালামু আলাইকুম। তাওয়াফের দোয়া নিয়ে অনেকের মনে একটা ভয় থাকে — মুখস্থ না থাকলে বুঝি তাওয়াফ হবে না। ভয়টা অমূলক। এই লেখায় সহজ করে বলছি কোনটা পড়া জরুরি, কোনটা সুন্নত, আর কীভাবে মন খুলে দোয়া করবেন। যা দোয়া দিলাম, সবই আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ।
তাওয়াফে কি প্রতি চক্করে আলাদা দোয়া মুখস্থ করতে হয়?
না। তাওয়াফের প্রতিটি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। মন খুলে নিজের ভাষায় দোয়া করাই যথেষ্ট — মাতৃভাষায় কাঁদতে কাঁদতে চাওয়াও আল্লাহর কাছে কবুল হয়, ইনশাআল্লাহ। কিছু দোয়া সুন্নত হিসেবে পড়া হয়, সেগুলো নিচে দিলাম। মুখস্থ না থাকলেও তাওয়াফ শুদ্ধ হবে।
তাই দোয়া মুখস্থ করার চাপ নেবেন না। বরং কী কী চাইবেন, তা আগে থেকে মনে মনে সাজিয়ে রাখুন — নিজের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য, সন্তানের জন্য। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে সেই চাওয়াগুলোই মন থেকে বলুন।
তাওয়াফ কীভাবে শুরু করবেন?
হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে তাওয়াফ শুরু করুন — কাবা শরীফ থাকবে আপনার বাম পাশে। সাত চক্কর পূর্ণ করতে হবে। ভিড়ে হাজরে আসওয়াদে চুমু দিতে না পারলে দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করলেই হবে; ধাক্কাধাক্কি করবেন না। শুরুতে অনেকে তাকবির বলে থাকেন।
তাওয়াফ শুরুর মুহূর্তে অনেকে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলেন। এই তাকবির ও শুরুর দোয়ার সঠিক আরবি ও উচ্চারণ আমাদের প্রশিক্ষণ ক্লাসে হাতে-কলমে শিখিয়ে দেওয়া হয় — যেন মুখস্থ নিয়ে দুশ্চিন্তা না থাকে।
রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত কোন দোয়া পড়বেন?
শেষ কোণা রুকনে ইয়ামানি ছুঁয়ে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত আসার পথে নিচের দোয়াটি পড়া সুন্নত। এটি কুরআনের দোয়া, ছোট এবং সহজে মনে থাকে — দুনিয়া ও আখিরাত দুটোরই কল্যাণ এতে চাওয়া হয়। প্রতিটি চক্করের শেষ অংশে এটি পড়তে পারেন।
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আজাবান-নার
হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।
সাঈর পথে সাফা-মারওয়ায় কী মনে রাখবেন?
তাওয়াফের পর সাঈ — সাফা পাহাড় থেকে শুরু করে মারওয়া পর্যন্ত সাতবার যাতায়াত। সাফায় উঠে আল্লাহর দিকে মুখ করে দোয়া করুন; মাঝের সবুজ বাতির অংশে পুরুষদের একটু দ্রুত হাঁটা সুন্নত। সাফা ও মারওয়া নিয়ে কুরআনের এই আয়াতটি মনে রাখলে সাঈর তাৎপর্য গভীরভাবে অনুভব করবেন।
তালবিয়া কখন ও কীভাবে পড়বেন?
ইহরাম বাঁধার পর থেকে তালবিয়া বেশি বেশি পড়তে থাকুন — এটি হজ্জ-উমরাহর প্রাণ। পুরুষরা উঁচু আওয়াজে, নারীরা নিচু স্বরে পড়বেন। উমরাহর তাওয়াফ শুরুর আগ পর্যন্ত তালবিয়া চলতে থাকে। এই দোয়াটি মুখস্থ করে নিলে পুরো সফরে বারবার কাজে লাগবে।
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান-নি’মাতা লাকা ওয়াল-মুলক, লা শারিকা লাক
আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই।
ভিড় সামলে কীভাবে শান্তমনে তাওয়াফ করবেন?
তাওয়াফের মূল ভয় হলো ভিড়। সহজ সমাধান — কম ভিড়ের সময় বেছে নিন। তাহাজ্জুদের পর ও দুপুরে সাধারণত চাপ কম থাকে। সাথে ছোট ব্যাগে পানি ও স্যান্ডেল রাখুন, আর দলছুট হলে আগে থেকে ঠিক করা মিলনস্থলে চলে যান। তাড়াহুড়া নয়, ধীরে-শান্তভাবে চক্কর দিন।
দোয়া নিয়ে সংশয়ে পড়লে সাথে থাকা মোয়াল্লেমকে জিজ্ঞেস করুন — এজন্যই তো আমরা প্রতিটি ধাপে পাশে থাকি। মূল কথা মনে রাখুন: আল্লাহ আপনার ভাষা বোঝেন, মুখস্থ দোয়ার চেয়ে মনের আকুতিই বড়।
সব লেখায় ফিরুন