আসসালামু আলাইকুম। হজ্জের আটটি ধাপ আসলে একটি ধারাবাহিক সফর — কোনটির পর কোনটি আসবে জানা থাকলে ভয়ের কিছুই নেই। এই গাইডে প্রতিটি ধাপের নিয়ম, দোয়া ও বাস্তব পরামর্শ সহজ বাংলায় দেওয়া হলো, যেন যাত্রার আগেই পুরো পথটি চোখে ভেসে ওঠে, ইনশাআল্লাহ।
ইহরামإِحْرَام
মিকাত থেকে নিয়ত ও তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে পবিত্র অবস্থায় প্রবেশ। পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরা সাদা কাপড়।
মিকাত হলো সেই সীমানা, যা অতিক্রমের আগে ইহরাম বাঁধতে হয়। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হাজীদের জন্য সাধারণত বিমানেই মিকাত ঘোষণা করা হয় — আমাদের মোয়াল্লেম আগে থেকে প্রস্তুত করিয়ে দেন, তাই তাড়াহুড়ার কিছু নেই।
গোসল করে সেলাইবিহীন দুই টুকরা সাদা কাপড় পরুন (মহিলারা স্বাভাবিক শালীন পোশাকে), দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিয়ত করুন। এরপর থেকে তালবিয়া পড়তে থাকুন।
ইহরামের তিন নিয়ম — আপনি কোনটিতে?
নিয়ত অনুযায়ী ইহরাম তিন রকম। কোন নিয়মে যাচ্ছেন তা যাত্রার আগেই মোয়াল্লেম নিশ্চিত করে দেন।
আগে শুধু উমরাহর ইহরাম; উমরাহ শেষে হালাল হয়ে যাবেন। এরপর ৮ জিলহজ্জ মক্কা থেকেই হজ্জের নতুন ইহরাম।
এক ইহরামেই উমরাহ ও হজ্জ — মাঝে ইহরাম খোলা যাবে না, ১০ জিলহজ্জ হলক পর্যন্ত একটানা।
শুধু হজ্জের নিয়তে ইহরাম — সাথে উমরাহ নেই। মক্কা ও আশপাশের অধিবাসীদের জন্য বেশি প্রযোজ্য।
ইহরামের আগে সুন্নত প্রস্তুতি
এগুলো মুস্তাহাব — কোনোটি ছুটে গেলেও ইহরাম ও হজ্জ শুদ্ধ থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান-নি’মাতা লাকা ওয়াল-মুলক, লা শারিকা লাক
আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই।
ইহরাম অবস্থায় যা নিষিদ্ধ
ইহরাম বাঁধার পর থেকে হলক পর্যন্ত এই কাজগুলো থেকে বিরত থাকুন।
ভুলবশত কিছু হয়ে গেলে ঘাবড়াবেন না — শুধু স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কেই হজ্জ নষ্ট হয়; অন্য ক্ষেত্রে হজ্জ শুদ্ধ থাকে, তবে ফিদইয়া (ক্ষতিপূরণ) দিতে হয়। এমন হলে সাথে সাথে মোয়াল্লেমকে জানান।
তাওয়াফطَوَاف
কাবা শরীফকে বামে রেখে সাতবার প্রদক্ষিণ — হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু, প্রতিটি চক্করে দোয়া।
হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে তাওয়াফ শুরু করুন — কাবা শরীফ থাকবে আপনার বাম পাশে। সাত চক্কর পূর্ণ করতে হবে; প্রতিটি চক্করে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়, মন খুলে দোয়া করুন।
রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত নিচের দোয়াটি পড়া সুন্নত। ভিড়ে পাথরে চুমু দিতে না পারলে দূর থেকে ইশারা করলেই হবে — ধাক্কাধাক্কি করবেন না।
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আজাবান-নার
হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।
সাঈسَعْي
সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার যাতায়াত — মা হাজেরা (আঃ)-এর স্মৃতির অনুসরণ।
তাওয়াফের পর সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু। সাফা থেকে মারওয়া এক যাত্রা — এভাবে সাতবার, শেষ হবে মারওয়ায়। মাঝের সবুজ বাতির অংশে পুরুষদের জন্য দ্রুত হাঁটা সুন্নত।
মিনায় অবস্থানمِنَى
৮ জিলহজ্জ (ইয়াওমুত তারবিয়া) মিনার তাঁবুর শহরে যাত্রা — জোহর থেকে পরদিন ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মিনায়। হজ্জের দিনগুলোর মূল আবাসস্থল এই তাঁবুই।
৮ জিলহজ্জ — ইয়াওমুত তারবিয়া দিয়ে হজ্জের মূল দিনগুলোর শুরু। হোটেল থেকে ইহরাম বেঁধে মিনার তাঁবুতে যাত্রা; জোহর থেকে পরদিন ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মিনায় আদায় করা সুন্নত।
মিনাই হজ্জের দিনগুলোর মূল আবাসস্থল — ১০ তারিখের রাত এবং আইয়ামে তাশরিকের (১১–১২ জিলহজ্জ) রাতগুলোও এখানে কাটবে। আমাদের কাফেলার তাঁবু নম্বর ও মুকতব আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়।
আরাফাহর অবস্থানعَرَفَة
৯ জিলহজ্জ দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাহর ময়দানে অবস্থান — হজ্জের মূল রুকন।
৯ জিলহজ্জ — হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাহর ময়দানে অবস্থানই হজ্জের মূল রুকন; এটি ছুটে গেলে হজ্জ হয় না। এই দিন বেশি বেশি দোয়া, ইস্তেগফার ও জিকিরে কাটান।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আরাফাহর দিনের শ্রেষ্ঠ দোয়া নিচেরটি। আমাদের মোয়াল্লেম পুরো দিনের রুটিন আগে থেকেই বুঝিয়ে দেন।
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির
আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
মুযদালিফায় রাতمُزْدَلِفَة
আরাফাহ থেকে ফিরে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন এবং রমির জন্য কংকর সংগ্রহ।
সূর্যাস্তের পর আরাফাহ থেকে মুযদালিফায় রওনা। এখানে মাগরিব ও এশা একসাথে পড়ে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করবেন — সঙ্গে রমির জন্য ৪৯ বা ৭০টি কংকর সংগ্রহ করুন (ছোলার দানার চেয়ে সামান্য বড়)।
রমি, কোরবানি ও হলকرَمْي الْجِمَار
জামারাতে কংকর নিক্ষেপ, কোরবানি এবং মাথা মুণ্ডন — এরপর ১১–১২ জিলহজ্জ (আইয়ামে তাশরিক) মিনায় থেকেই প্রতিদিন তিন জামারায় রমি।
১০ জিলহজ্জ: বড় জামারায় ৭টি কংকর, এরপর কোরবানি, তারপর মাথা মুণ্ডন (হলক) বা চুল ছোট করা (কসর) — এই ক্রমে। আমাদের প্যাকেজে কোরবানির ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত, কুপন আমরাই সংগ্রহ করি।
১১ ও ১২ জিলহজ্জ প্রতিদিন তিন জামারায় রমি চলবে। ভিড়ের নিরাপদ সময় মোয়াল্লেম ঠিক করে দেন — দল ছেড়ে একা যাবেন না।
বিদায়ী তাওয়াফطَوَاف الْوَدَاع
মক্কা ত্যাগের আগে পবিত্র ঘরের শেষ প্রদক্ষিণ — অশ্রুসিক্ত বিদায়।
মক্কা ত্যাগের আগে শেষ আমল — বিদায়ী তাওয়াফ। সাত চক্কর শেষে দুই রাকাত নামাজ পড়ে জমজমের পানি পান করুন। এরপর পবিত্র ঘরের দিকে ফিরে দোয়া করতে করতে বিদায় নিন — অধিকাংশ হাজীর চোখ এখানে ভিজে আসে।
পুরো সফরে যে আমলগুলো সফরকে আলোকিত করে
ফরজ-ওয়াজিবের পাশাপাশি এই সুন্নত ও মুস্তাহাব আমলগুলোই হজ্জের প্রকৃত স্বাদ, ইনশাআল্লাহ।

